Gillette: যে মানুষটি আমাকে দেখেছিলেন

Gillette: The Man Who Saw Me — The First Blade, My Gillette, chapter 15

প্রথম ব্লেড, আমার Gillette · বাংলা সংস্করণ  ·  নং 15

Gillette: যে মানুষটি আমাকে দেখেছিলেন


একজন গুরু পাওয়ার সৌভাগ্য আমার কখনো হয়নি।

জীবনের প্রথম সাতাশ বছর আমার দেখা হয়েছে প্রায় শুধুই নারীদের সঙ্গে। সব রকম মেজাজের, সব রকম সংবেদনশীলতার, বুদ্ধি আর মনুষ্যত্বের সব রকম উচ্চতার নারী। হয়তো জীবন আমাকে শুধু একটা প্রাথমিক সত্য মনে করিয়ে দিতে চেয়েছিল: আমিও এক নারীর সন্তান। আর সে কী সন্তান।

তারপর এল 1992।

কোসেন্‌জার শিক্ষা খাতের এক উদ্যোক্তাকে ঘিরে গড়ে ওঠা একটা রাজনৈতিক প্রচারাভিযান, যে উদ্যোক্তা পরে সব প্রত্যাশা উল্টে দিয়ে ইতালির সংসদের সদস্য হবেন, বহু কিছুর গতিপথ বদলে দিল। খোদ রাজনীতির জন্য নয়, বরং যে মানুষগুলোর সঙ্গে দেখা হওয়ার সুযোগ আমাকে দেওয়া হয়েছিল, তাঁদের জন্য। সম্ভাবনার দরজাটা তাঁরাই খুলে দিয়েছিলেন।

অন্তর্ভুক্তির ওপর গড়া এক জগতে আমি ছিলাম নবিশ। আমি কোথা থেকে এসেছি, কেউ বুঝে উঠতে পারত না।

প্রশ্নটা সব সময় একই ছিল।

“ওকে কেউ দীক্ষা দেয়নি কেন? কেউ ওকে নিজের ডানার নিচে টেনে নেয়নি কেন?”

তাঁদের চোখে আমি ছিলাম এক অমসৃণ পাথর, যার গায়ে তখনো কেউ হাত লাগায়নি।

নানা দিক থেকে আসতে লাগল আমন্ত্রণ, কাছে আসার চেষ্টা, প্রস্তাব। প্রায়ই সেগুলোর জন্ম হত এমন সব পরিবেশে, যাদের সঙ্গে সংস্কৃতি, ইতিহাস বা অন্তরের সত্যিকারের বিকাশের সম্পর্ক সামান্যই। সেসব জগৎ টিকে ছিল বশ্যতা, আধিপত্য আর নিছক ক্ষমতা খাটানোর ওপর।

আমি সেগুলোকে দেখতাম শ্রদ্ধা নিয়ে, তবে দূর থেকে।

কিছু ঘর ছিল, যেখানে আমি ঢুকতে চাইনি।

আর আমি ঢুকিনি।

তারপর একদিন একটা ফোন এল।

ফোন করেছিলেন জিনো দোমানিকো, জীবনের এক সত্যিকারের গুরু।

বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, নিজেকে যিনি শিক্ষকতায় সঁপে দেওয়ার পথ বেছে নিয়েছিলেন। কথা বলার সেই বিরল আভিজাত্য তাঁর ছিল, যা শেখানো যায় না, নকলও করা যায় না। মাত্র কয়েক মুহূর্ত কথা বলার পরই আমি এমন একটা কিছু বুঝলাম, যা সে সময় আমার কাছে উদ্ভট ঠেকেছিল এবং যা আমি আজও বিশ্বাস করি:

সদ্য আমার দেখা হয়েছে সেই মানুষটির সঙ্গে, যাঁর হাতে আমি আমার বেড়ে ওঠার একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ তুলে দেব।

তিনি আমাকে রাতের খাবারে নিমন্ত্রণ করলেন।

সেটা কখনোই মন জয়ের চেষ্টা ছিল না, আনুষ্ঠানিক পাঠও নয়। জিনোর একটা বিশেষ ক্ষমতা ছিল: তিনি আত্মা আর মন পড়তে পারতেন। আমারটা সম্ভবত তাঁর কাছে ছিল খোলা বই।

তাঁর ভূমিকা কী, কোন ঐতিহ্য থেকে তিনি এসেছেন, তা তিনি কখনো ব্যাখ্যা করেননি। শুধু একটা বাক্য আমার কাছে রেখে গিয়েছিলেন, যা আমি কখনো ভুলিনি:

“একদিন, যখন তুমি আমাকে সত্যিই দেখবে, পর্দা থাকুক বা না থাকুক, তখন জানবে আমি কে আর আমি কোথায়।”

নবিশ হয়েও কথাগুলোর মানে আমি বুঝেছিলাম।

আমি ছিলাম এমন এক মানুষ, যে এক মন্দিরের দরজায় কড়া নেড়ে আলো চাইছে। বস্তুগত আলো নয়, কারণ আমরা দুজনের কেউই বিদ্যুৎ কোম্পানিতে কাজ করতাম না, বরং সেই আলো, যা মানুষকে নিজেকে আরও স্পষ্ট দেখতে দেয়।

স্বাগত জানানোর প্রথম ইশারাটা করলেন জিনো।

তারপর এলেন তোনিনো।

প্রতিষ্ঠানের ভেতরে সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তিদের একজন। অল্প কিছুক্ষণ আমাকে লক্ষ করেই তিনি সেই একই প্রশ্ন করলেন, যা আমি আগেও বহুবার শুনেছিলাম।

“এতদিন ওকে কেউ দেখেনি কেন? এতগুলো বছর ও ছিল কোথায়?”

উত্তরটা সহজ ছিল।

“ও কোসেন্‌জায় কাজ করে। জন্ম রেজ্জো কালাব্রিয়ায়। অর্ধেক দুনিয়া ওর চেনা। লোকে ওকে ভালোবাসে। আর ও আমাদেরই একজন। তফাত শুধু এটুকুই যে ক্যাথলিক বাপ্তিস্মের পর ও আর কোনো দীক্ষা পায়নি।”

ওই উত্তরই যথেষ্ট ছিল।

বিধবার সন্তানদের জন্য সংরক্ষিত পথে, যথাযথ রীতিতে ও যথাযথ সময়ে, যাত্রা শুরু করার অনুমতি আমি পেলাম।

সেই মুহূর্ত থেকে জিনো কখনো আমার হাত ধরেননি।

দরকার পড়েনি।

তাঁর এক পলকের চাহনি আর দু-চারটে কথাই যথেষ্ট ছিল। তাঁর সঙ্গে থাকলে একটা নীরবতাও পাঁচশো পাতার বইয়ের চেয়ে বেশি শিক্ষা ধরে রাখতে পারত।

তারপর দিনটা এল।

তাঁকে পেলাম সেখানে, বেঞ্চগুলোর মাঝখানে।

নীরব। প্রায় কঠোর।

জায়গাটা একটা বিশেষ ভঙ্গি দাবি করত, আগে ভেতরের, পরে বাইরের।

চিন্তন-কক্ষের বাইরের পরিসরে, হারানো পদক্ষেপের হলে, এক ছোট্ট বিরতিতে আমরা দেখলাম, দুজনে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছি। তিনি বিশেষ কিছু না বলেই আমার কাছে এগিয়ে এলেন। তবু সেই মুহূর্তে আমরা দুজনেই একই আবেগ অনুভব করলাম।

এমন এক আবেগ, যা কখনো ম্লান হয়নি।

তেত্রিশ বছর পরেও তা এখানেই আছে।

হয়তো এই কারণে যে কিছু সাক্ষাৎ অতীতের জিনিস নয়।

যতবার আমরা সেগুলো মনে করি, ততবার সেগুলো আমাদের দীক্ষা দিয়ে চলে।

TFA
ফের্দিনান্দো ফ্রেগা

পুনশ্চ

এই গল্পটা লেখার পর আমার মনে হল, মোজাইকের একটা খাঁটি টুকরো যেন বাদ পড়ে গেছে। সেটা কী, তা বুঝতে রাতের বেলা কয়েক ঘণ্টার ভাবনাই আমার জন্য যথেষ্ট ছিল।

সেই গ্রীষ্মে জিনো ছিলেন সমুদ্রের ধারে তাঁর ভিলায়। বেশ কয়েকবার তিনি আমাকে তাঁর কাছে যেতে নিমন্ত্রণ করেছিলেন, আর এক সন্ধ্যায় আমি অবশেষে তাঁর দরজায় কড়া নাড়ার সুযোগ পেলাম।

তিনি আমাকে এমন এক স্নেহে বরণ করলেন, যা আমি কখনো ভুলিনি, আর সেই উপলক্ষেই আমার পরিচয় হল তাঁর জীবনের নারী তেরেসার সঙ্গে।

তিনি ছিলেন তরুণী, রুচিশীল, সহজাতভাবেই সৌজন্যময়ী। যারা অন্যদের তাক লাগাতে চায়, সেই গোত্রের মানুষ তিনি ছিলেন না। এক প্রাণবন্ত বুদ্ধি আর তার সঙ্গে সামনে দাঁড়ানো মানুষটিকে বুঝে নেওয়ার এক বিরল ক্ষমতার আঁচ পেতে কয়েক মিনিটই যথেষ্ট ছিল।

তিনি ব্যাংকে কাজ করতেন, দায়িত্বপূর্ণ পদে ছিলেন। পরের বছরগুলোতে তাঁকে ভালো করে চিনতেন এমন বন্ধু আর সহকর্মীদের মুখে আমি আশ্চর্য রকম একই ধরনের মন্তব্য শুনেছি: তেরেসার ছিল এক অসাধারণ স্বজ্ঞা আর মানুষের নির্ভরযোগ্যতা প্রায় সঙ্গে সঙ্গে যাচাই করে ফেলার এক অসামান্য ক্ষমতা।

আমাদের মধ্যে একটা সহজ বোঝাপড়া আপনা থেকেই গড়ে উঠল।

এটা বোঝা সহজ ছিল যে আমরা দুজনেই একই মানুষকে গভীরভাবে ভালোবাসি। স্বভাবতই ভিন্ন ভিন্নভাবে, তবে মূলে সেই একই স্নেহ নিয়ে।

যত্ন নেওয়ার মতো হৃদয়ের এক বোন আমি পেয়েছিলাম। তিনি এসব কথা কখনো মুখে বলেননি, তবু প্রায়ই আমার মনে হত, তিনিও একই রকম কিছু একটা চিনে নিয়েছিলেন।

তবে সেই সাক্ষাতের আরও গুরুত্বপূর্ণ একটা ফল হয়েছিল।

সেটা এমন এক প্রত্যয়কে পোক্ত করল, যাকে সময় কখনো মিথ্যা প্রমাণ করেনি: একজন ভালো গুরু প্রায় সব সময়ই ধরা দেন তাঁর পাশে হেঁটে চলা নারীটির চোখের ভেতর দিয়ে। তিনি মায়ের জায়গা নেন না, মায়ের সঙ্গে তাঁকে গুলিয়েও ফেলা হয় না। তিনি পুরুষটির মানবিক প্রতিকৃতিটা সম্পূর্ণ করেন।

আর আমার গুরু ছিলেন সেই পুরুষদেরই একজন।


শুভেচ্ছাসহ,
ফের্দিনান্দো ফ্রেগা

PDF ← প্রথম ব্লেড, আমার Gillette