সম্প্রদায়ের গাথা · বাংলা সংস্করণ · চৌকাঠ 14
আমি কাঁদতে শিখলাম
বহু বছর আমি ভেবেছি, শক্তি মানে নিয়ন্ত্রণ। কথা নিয়ন্ত্রণ করা। অনুভূতি নিয়ন্ত্রণ করা। প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করা। যন্ত্রণা নিয়ন্ত্রণ করা। ধারণাটা আমি ধীরে ধীরে শুষে নিয়েছিলাম, গভীর বিশ্বাস যেভাবে জন্মায়। কেউ আমাকে খোলাখুলি শেখায়নি। কেউ আমাকে বলেনি: “পুরুষমানুষ কাঁদে না।” তবু সেই বার্তা সর্বত্র ছিল। কথাবার্তায়। আচরণে। উদাহরণে। দৃষ্টিতে। সংস্কৃতির ভেতরেই। তাই আমি অল্প বয়সেই একটা সরল নিয়ম শিখে ফেললাম। সহ্য করা। সবসময়। যা-ই ঘটুক। সহ্য করা। তরুণ বয়সে ভাবতাম এটা একটা গুণ। আজ জানি, এ ছিল কেবল একটা কৌশল। কিছু মুহূর্তে কাজের কৌশল। আরও অনেক মুহূর্তে বিপজ্জনক। কারণ যা কিছু বহুদিন চেপে রাখা হয়, তা আগে হোক পরে হোক বেরোনোর পথ খোঁজে। যন্ত্রণা মিলিয়ে যায় না। ভয় মিলিয়ে যায় না। বিষাদ মিলিয়ে যায় না। তারা চেহারা বদলায়। লুকিয়ে পড়ে। অপেক্ষা করে। তারপর, যখন সবচেয়ে কম আশা করি, দরজায় টোকা দেয়। জীবনের এমন এক পর্বের কথা মনে পড়ে, যখন সবকিছুই যেন শক্তি দাবি করছিল। কাজ। পরিবার। দায়িত্ব। অসুখ। সিদ্ধান্ত।
যারা আমার উপর ভরসা করত, সেইসব মানুষ। যাদের একটা উত্তর দরকার ছিল, সেইসব মানুষ। যারা একটা দিকনির্দেশ খুঁজছিল, সেইসব মানুষ। থামার অনুমতি নিজেকে দিতে পারতাম না। অন্তত তাই ভাবতাম। রোজ একটা করে নতুন ভার জুড়তাম। নিজের কথা শোনার মুহূর্তটা রোজ আরও পিছিয়ে দিতাম। আরও পরে। ক্রমশ আরও পরে। মানুষ কতদিন নিজের ভেতরের জগতকে উপেক্ষা করে থাকতে পারে, তা অবাক করার মতো। কিন্তু চিরকাল নয়। কেউই চিরকাল পারে না। এমন একটা মুহূর্ত আসে, যখন শরীর বলতে শুরু করে যা কণ্ঠস্বর বলতে চায় না। ক্লান্তি বাড়ে। ঘুম বদলে যায়। মন ক্লান্ত হয়। অনুভূতি আরও ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। আর ধীরে ধীরে বোঝো, তুমি পৃথিবীর বিরুদ্ধে লড়ছ না। তুমি লড়ছ নিজের বিরুদ্ধে। সত্যটা এসেছিল সহজভাবে। খাঁটি সত্য যেভাবে সবসময় আসে। কোনও আলোর কারসাজি ছাড়া। কোনও ঘোষণা ছাড়া। কোনও নাটক ছাড়া। একদিন ভারটা হয়ে গেল বড্ড বেশি। আর প্রতিরক্ষা বড্ড কম। নীরবতাটা মনে আছে। একাকিত্বটা মনে আছে। কোনও ভূমিকা পালন করতে হবে না, সেই আচমকা বোধটা মনে আছে। অনেকদিন পর প্রথমবার আমি কোনও পেশাদার ছিলাম না। আমি বাবা ছিলাম না। আমি স্বামী ছিলাম না। আমি কোনও কর্তা ছিলাম না। আমি লেখক ছিলাম না। আমি ছিলাম কেবল একজন মানুষ। আর আমি কাঁদলাম। মার্জিত কান্না নয়। সংযত কান্না নয়।
সত্যিকারের কান্না। যে কান্না আসে অনেক দূর থেকে। যে কান্না বছরের পর বছর পেরিয়ে আসে। যে কান্না সঙ্গে করে আনে এমন সব জিনিস, যা জমিয়ে রেখেছিলে বলে মনেও ছিল না। যখন এটা ঘটছিল, আমার এক অপ্রত্যাশিত বোধ হল। দুর্বলতার নয়। মুক্তির। যেন বহুদিন বন্ধ থাকা একটা ঘর শেষ পর্যন্ত জানালা খুলে দিয়েছে। যেন হাওয়া আবার চলাচল করছে। যেন কিছু একটা অবশেষে চেপে থাকা ছেড়ে দিল। তখনই আমি একটা মৌলিক জিনিস বুঝলাম। অনুভূতি শত্রু নয়। তারা বার্তাবাহক। তারা আসে আমাদের কিছু বলতে। এড়িয়ে গেলে তারা মুছে যায় না। শুধু আরও জোরে ডাকে। বছরের পর বছর আমি ভেবেছি, সাহস মানে হার না মানা। সেই মুহূর্তে বুঝলাম, সাহস মানে নিজের ভেতর দিয়ে যেতে দেওয়াও। যন্ত্রণাকে। ভয়কে। বিষাদকে। সত্যকে। মানুষ প্রায়ই ভঙ্গুরতাকে ফাটল বলে ভাবে। আমি আবিষ্কার করলাম, ওটা দরজাও হতে পারে। কারণ যেই মুহূর্তে তুমি সবকিছুর থেকে নিজেকে আড়াল করা ছাড়ো, ঠিক তখনই তুমি নিজেকে চিনতে শুরু করো। আর নিজেকে চেনা বাইরের বহু লড়াই জেতার চেয়ে অনেক কঠিন। সেদিন থেকে কিছু একটা বদলাল। আমি হঠাৎ করে আরও জ্ঞানী হয়ে যাইনি। হঠাৎ করে আরও শক্ত হয়ে যাইনি। আমি হলাম আরও খাঁটি। যা আলাদা জিনিস। আমি অন্যভাবে কথা বলতে শুরু করলাম। অন্যভাবে শুনতে। অন্যদের দিকে আরও বেশি বোঝাপড়া নিয়ে তাকাতে। কারণ যে নিজের যন্ত্রণা পেরিয়েছে, সে অন্যের যন্ত্রণা সহজে চিনতে পারে। সে তার বিচার করে না। তাকে ছোট করে না। তৎক্ষুনি সমাধান খোঁজে না।
সে তাকে স্বীকার করে। আর এই স্বীকৃতিই ইতিমধ্যে এক ধরনের সাহায্য। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে আমি ভঙ্গুরতাকে নতুন আলোয় দেখতে শুরু করলাম। যাদের আমি সবচেয়ে বেশি শ্রদ্ধা করতাম, তারা আপাত-অজেয় লোক ছিল না। তারা ছিল খাঁটি মানুষ। যারা নিজেদের মনুষ্যত্ব দেখাতে পারত, তাকে তামাশা না বানিয়ে। যারা বলতে ভয় পেত না: “আমি আমার যতটুকু সাধ্য করছি।” কারণ শেষপর্যন্ত আমরা সবাই এটাই করি। আমাদের সাধ্যমতো। কোনও কোনও দিন তা অনেকটা। অন্য দিনে অল্প। কিন্তু ওটুকুই সবসময় আমাদের হাতে থাকে। পিছনে তাকিয়ে আমি সেই মুহূর্তকে পরাজয় বলে ধরি না। আমি ওটাকে ধরি একটা চৌকাঠ বলে। আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণগুলোর একটা। আগে ভাবতাম শক্তি মানে না-কাঁদা। পরে বুঝলাম শক্তি মানে নিজের চোখের জলকে ভয় না পাওয়া। কারণ এক ধরনের পরিণতি আছে যা আসে কেবল তখনই, যখন আমরা ভান করা ছাড়ি। যখন লোকদেখানো ছাড়ি। যখন অভিনয় ছাড়ি। আর অবশেষে নিজেদের মানবিক স্বভাব মেনে নিই। ভঙ্গুর। অসম্পূর্ণ। চমৎকারভাবে অসম্পূর্ণ। আজ আমার দিনটা ঠিক মনে নেই। সময়টা মনে নেই। এমনকি সব পরিস্থিতিও মনে নেই। মনে আছে কেবল যা শিখেছিলাম। যে ভাগ করে নেওয়া যন্ত্রণার ভার কম। যে সত্য অহংকারের চেয়ে বেশি মুক্তি দেয়। যে ভঙ্গুরতা মর্যাদা নষ্ট করে না। তাকে সম্পূর্ণ করে। আর সবার আগে মনে আছে একটা কথা, যা তখন আমি উচ্চারণ করতে জানতাম না। একটা সরল কথা। এমন এক কথা যা অনেক কিছু বদলে দিল। আমি কাঁদতে শিখলাম। আর সেদিন থেকে আমি নিজেকে ভালো বুঝতে শুরু করলাম।
Ferdinando Frega
Gillette Man ⚔️