পাশে থাকাই যথেষ্ট

সম্প্রদায়ের গাথা · বাংলা সংস্করণ  ·  চৌকাঠ 13

পাশে থাকাই যথেষ্ট


জীবনের অনেকটা সময় আমি ভেবেছি, মানুষের মূল্য মাপা হয় সে কী করে উঠতে পারল তা দিয়ে। বিশ্বাসটা যুক্তিসঙ্গত ছিল। পৃথিবীটাই যেন ইচ্ছে করে ওটা প্রমাণ করার জন্য বানানো। আমাদের কাছে ফলাফল চাওয়া হয়। সংখ্যা। লক্ষ্যমাত্রা। কর্মদক্ষতা। মাইলফলক। প্রতিটি ব্যবস্থার নিজস্ব সূচক আছে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ক্রমতালিকা আছে। প্রতিটি যুগ সাফল্য মাপার আলাদা কায়দা বানায়। আর মাপকাঠি প্রায় সবসময়ই তাকায় যা চোখে পড়ে তার দিকে। যা থেকে যায়, তার দিকে কদাচিৎ। তবু বছর গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে আমি একটা অদ্ভুত ব্যাপার লক্ষ করতে শুরু করলাম। যাদের কথা আমার সবচেয়ে বেশি মনে থাকত, তারা প্রায় কখনওই সেই লোকেরা নয় যারা সবচেয়ে চোখধাঁধানো ফল করেছিল। আমার মনে থাকত অন্য মানুষদের কথা। যারা কাছে থেকে গিয়েছিল। যারা শুনেছিল। যারা সময় বের করেছিল। যারা উপস্থিত ছিল। মানুষের স্মৃতি যতটা মনে হয়, ততটা সহজে ছাপ নেয় না। কয়েক দশক পরেও সে শুধু তোমার কাজ মনে রাখে না। সে মনে রাখে, তুমি অন্যদের কেমন বোধ করিয়েছিলে। আর এই আবিষ্কার অনেক কিছু বদলে দিল। বদলটা এসেছিল ধীরে। সব খাঁটি রূপান্তর যেমন আসে। কোনও আচমকা উন্মোচন ছিল না। ছিল শয়ে শয়ে ঘটনা। ছোট। প্রায় অদৃশ্য। এক বন্ধু, যে না ডাকতেই এসে হাজির হয়। এক মানুষ, যে কঠিন মুহূর্তে তোমার পাশে বসে থাকে। এক আত্মীয়, যে সমস্যাটা মেটাতে পারে না, তবু ভারটা ভাগ করে নিতে চায়। এসব ক্ষেত্রে এমন কিছু ঘটে, যা সংখ্যা দিয়ে মাপা যায় না। পাশে থাকা শক্তি তৈরি করে। যন্ত্রণা মুছে দেয় বলে নয়। বরং একাকিত্বকে নিরঙ্কুশ হতে দেয় না বলে। অনেকে ভাবে, সাহায্য করা মানে সমাধান খুঁজে দেওয়া।

আমি আর তত নিশ্চিত নই। যারা আমাকে সত্যিই সাহায্য করেছে, তাদের কাছে সবসময় উত্তর ছিল না। প্রায়ই তাদের কাছে ছিল শুধু থেকে যাওয়ার ইচ্ছেটুকু। আর তাতেই হয়ে যেত। অল্পবয়সে আমরা ভাবি, মূল্য থাকে কাজে। সময়ের সঙ্গে টের পাই, মূল্য প্রায়ই থাকে থেকে যাওয়ায়। সেখানে থাকা। পালিয়ে না যাওয়া। মন অন্যদিকে না দেওয়া। অন্যের ঘাড়ে না চাপানো। উধাও না হওয়া। হাজির থাকা। সামান্য মনে হয়। মোটেই সামান্য নয়। আমরা এমন এক সমাজে থাকি যা যোগাযোগে ভরা আর উপস্থিতিতে প্রায়ই কাঙাল। কয়েক সেকেন্ডে আমরা যে কারও নাগাল পাই। পৃথিবীর যে কোনও প্রান্তে বার্তা পাঠাতে পারি। অবিরাম কথা চালাতে পারি। তবু অনেক মানুষ আগের চেয়ে বেশি একা বোধ করে। হয়তো কারণ, উপস্থিতি প্রযুক্তির ব্যাপার নয়। এ মানুষের ব্যাপার। উপস্থিতির জন্য দরকার মনোযোগ। আর মনোযোগ আমাদের সময়ের বিরলতম সম্পদগুলোর একটা হয়ে উঠেছে। জীবনের এমন কিছু পর্বের কথা মনে পড়ে, যখন আমি পরামর্শ খুঁজছিলাম না। কৌশল খুঁজছিলাম না। উত্তর খুঁজছিলাম না। আমি খুঁজছিলাম সঙ্গ। এমন কাউকে, যে খানিকটা পথ ভাগ করে নিতে রাজি। এমন কেউ, যে বলতে রাজি: “জানি না শেষটা কী হবে, তবে এটা তোমাকে একা পেরোতে হবে না।” এই কথাগুলো ঘটনা বদলায় না। আমাদের বদলে দেয়। আর সেটা অনেক বেশি জরুরি। বহু বছর আমি এমন পরিবেশে কাজ করেছি যেখানে সবকিছু মাপা হত। কর্মদক্ষতা। বাজারের অংশ। বৃদ্ধি। উৎপাদনশীলতা।

তবু যা কিছু সবচেয়ে মূল্যবান পেয়েছি, তার কিছুই কোনও রিপোর্টে ওঠেনি। আস্থা। বিশ্বস্ততা। শোনা। কাছে থাকা। এর কোনওটাই সহজে ছকে ঢোকে না। তবু মানুষের জীবনের অনেকখানি এগুলোই ধরে রাখে। উপস্থিতিও ঠিক এভাবেই কাজ করে। থাকলে তা অদৃশ্য। না থাকলে তা স্পষ্ট। বাতাসের মতো। স্বাস্থ্যের মতো। কিছু স্নেহের মতো। এদের দাম আমরা সবচেয়ে বেশি টের পাই ঠিক যখন এরা আর হাতের নাগালে থাকে না। বয়স বাড়ার সঙ্গে আমি এমন এক শিক্ষা পেলাম যা কোনও বই দেয়নি। অনেক সমস্যা তৎক্ষুনি সমাধান চায় না। তারা চায় পেরিয়ে যাওয়া হোক। আর যে সমস্যা পেরোতে হয়, সেখানে দক্ষতার চেয়ে উপস্থিতির দাম বেশি। কথাটা অদ্ভুত শোনাতে পারে। কিন্তু যে কোনও বড় পরীক্ষার ভেতর দিয়ে গেছে, সে সঙ্গে সঙ্গে বুঝবে। কোনও ব্যাখ্যা একটা ক্ষতি মুছে দেয় না। কোনও কৌশল একটা অসুখ মুছে দেয় না। কোনও তত্ত্ব একটা অনুপস্থিতি মুছে দেয় না। এমন কিছু পরিস্থিতি আছে, যেখানে মানুষকে শুধরে দেওয়ার দরকার নেই। তার দরকার সঙ্গ পাওয়ার। এই আবিষ্কার অন্যদের সঙ্গে আমার সম্পর্কের ধরনও বদলে দিল। সবকিছুর সমাধান বের করার দায় বোধ করা ছাড়লাম। নীরবতাকে ব্যর্থতা ভাবা ছাড়লাম। আমার মূল্য পৃথিবী সারানোর ক্ষমতার উপর নির্ভর করে, এই বিশ্বাস ছাড়লাম। বদলে আমি অন্য একটা গুণ গড়ে তুলতে শুরু করলাম। সহজলভ্যতা। হাতের কাছে থাকা। পরিবারের জন্য। বন্ধুদের জন্য। ভঙ্গুর মানুষদের জন্য। যে কেউ কোনও কষ্টের ভেতর দিয়ে যাচ্ছিল, তার জন্য। যার শোনার লোক দরকার ছিল, তার জন্য।

এ কম চটকদার দক্ষতা। কিন্তু অসীম বেশি কাজের। পিছনে তাকিয়ে দেখি, আমার জীবনের সবচেয়ে অর্থবহ মুহূর্তগুলোর প্রায়ই একটা মিল আছে। কেউ একজন পাশে ছিল। কখনও সেটা আমি। কখনও অন্যরা। কিন্তু একটা উপস্থিতি ছিল। নিঃশব্দ উপস্থিতি। বিনীত। জোর না খাটানো। এমন উপস্থিতি যা কিছু দাবি করত না। যা কোনও স্বীকৃতি চাইত না। যা কোনও হাততালি খুঁজত না। সে শুধু ছিল। রাতের বেলায় জানালায় জ্বলে থাকা আলোর মতো। হয়তো পরিণত হওয়া মানে এটাও। বোঝা যে রোজ অসাধারণ হতে হয় না। পৃথিবী বাঁচাতে হয় না। সবাইকে বোঝাতে হয় না। প্রতিটি লড়াই জিততে হয় না। কখনও কখনও শুধু সেখানে থাকতে হয়। সত্যি করে। সমস্ত মনোযোগ নিয়ে। সমস্ত মনুষ্যত্ব নিয়ে। সমস্ত অসম্পূর্ণতা নিয়ে। কারণ মানুষ অনেক কিছু ভুলে যায়। কথা ভুলে যায়। তারিখ ভুলে যায়। বড় ঘটনাও ভুলে যায়। কিন্তু দরকারের সময় কে পাশে ছিল, তা তারা কদাচিৎ ভোলে। শেষমেশ, কাজ, ভ্রমণ, সাফল্য, ক্ষতি, রূপান্তর আর বয়ে যাওয়া সময়ের পরে একটা আশ্চর্য সরল সত্য পড়ে থাকে। যা ঘটে, তা আমরা সবসময় বদলাতে পারি না। সবসময় সারিয়ে তুলতে পারি না। সবসময় বাঁচাতে পারি না। সবসময় বুঝতেও পারি না। কিন্তু আমরা পাশে থাকতে পারি। আর আমরা যতটা ভাবি তার চেয়ে অনেক বেশিবার, পাশে থাকাই যথেষ্ট।


Ferdinando Frega
Gillette Man ⚔️

PDF← সম্প্রদায়ের গাথা

অন্য গাথাগুলি দেখুন

Library · Vatican · Genesis · Opera

← Return to Main