যেদিন সব ভেঙে গেল

সম্প্রদায়ের গাথা · বাংলা সংস্করণ  ·  চৌকাঠ 10

যেদিন সব ভেঙে গেল


কেউ জানে না সেটা কোন দিন হবে। এটাই প্রথম সত্য। আমরা পরিকল্পনা করতে পারি। আমরা আগাম আঁচ করতে পারি। আমরা ব্যবস্থা, কৌশল, সুরক্ষা আর সঞ্চয় গড়ে তুলতে পারি। নিজেদের বোঝাতে পারি যে অভিজ্ঞতা এক ধরনের প্রতিরোধক্ষমতা। কিন্তু একটা দিন সব সময়ই আসে, যেদিন কিছু একটা ভেঙে যায়। কখনও সেটা একজন মানুষ। কখনও একটা মোহ। কখনও একটা কাজ। কখনও শরীর। কখনও একটা সম্পর্ক। কখনও এমন এক নিশ্চয়তা, যাকে আমরা অটল ভেবেছিলাম। ওই দিনটাকে এত আলাদা করে তোলে এই ব্যাপারটাই যে, প্রায় সব সময়ই আমরা তাকে চিনতে পারি অনেক পরে। যখন ঘটে, তখন মনে হয় একটা ঘটনা। পরে বুঝি, ওটা ছিল একটা সীমানা। আমারও নিজের একটা দিন ছিল। সম্ভবত একটার বেশি। কারণ ফাটল বিলোতে জীবন উদার। সে তোমার বয়স জিজ্ঞেস করে না। সে তোমার পদ জিজ্ঞেস করে না। সে তোমার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট জিজ্ঞেস করে না। সে তোমার জীবনপঞ্জি জিজ্ঞেস করে না। সে শুধু দরজায় কড়া নাড়ে। একটা নির্দিষ্ট অনুভূতির কথা মনে আছে। যন্ত্রণা নয়। ভয় নয়। বিস্ময়। কত দ্রুত একটা জীবনের দৃশ্যপট বদলে যেতে পারে, তা আবিষ্কারের বিস্ময়। একদিন সবকিছু স্থির মনে হয়। পরদিন সেই স্থিরতা স্মৃতি হয়ে যায়। আর তুমি নিজেকে দেখতে পাও, যাকে চিরস্থায়ী ভেবেছিলে তারই ধ্বংসস্তূপের দিকে তাকিয়ে আছ। ঠিক সেই মুহূর্তে অস্তিত্বের সবচেয়ে বড় মোহগুলোর একটাকে তুমি চিনতে পারো। আমরা ভাবি, যা হারাই তার জন্যই কষ্ট পাই। প্রায়ই কষ্ট পাই যাকে চিরন্তন বলে বিশ্বাস করেছিলাম, তার জন্য। হারানো একটা ঘটনাকে ধ্বংস করে। মোহভঙ্গ ধ্বংস করে একটা বিশ্বাসকে। আর বিশ্বাসের শিকড় গভীর। কিছু সত্যিই ভেঙে গেলে প্রথম ঝোঁক হয় সারিয়ে তোলার। এটা মানুষেরই স্বভাব।

আমরা সঙ্গে সঙ্গে একটা সমাধান খুঁজি। একটা ব্যাখ্যা। একটা প্রতিকার। দোষ দেওয়ার মতো কাউকে। যা খুশি, কেবল এটা মেনে নেওয়া ছাড়া যে কিছু জিনিস আর তার আগের চেহারায় গড়ে তোলা যায় না। আমিও ওই লড়াইটা লড়েছি। সবার মতোই। বাস্তবের বিরুদ্ধে লড়াই। কারণ বাস্তব নির্মম। সে দরকষাকষি করে না। সে সান্ত্বনা দেয় না। সে আছে। ব্যস, এইটুকুই। এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন জীবন তোমাকে তৈরি হওয়ার সময় দেয় না। সে তোমাকে ঠেলে দেয় রূপান্তরের ভিতর। তুমি চাও বা না চাও। সেখানেই তুমি টের পাও তুমি কে। সব যখন ঠিকঠাক চলে, তখন নয়। যখন কিছু একটা চলা বন্ধ করে। যখন তুমি পাও, তখন নয়। যখন হারাও। যখন গড়ো, তখন নয়। যখন গড়া জিনিসের একটা অংশ ভেঙে পড়তে দেখো। অনেকে স্থিতিস্থাপকতাকে বীরত্বের গুণ বলে ভাবে। আমি সব সময় অন্যভাবে দেখেছি। স্থিতিস্থাপকতা শক্তি নয়। সে মানিয়ে নেওয়া। শক্তি বলে: “আমি রুখে দাঁড়াব।” স্থিতিস্থাপকতা বলে: “আমি নিজেকে বদলে নেব।” আর তফাতটা বিরাট। কারণ কিছু ঝড় জেতা যায় না। কেবল পেরোনো যায়। জীবনে এমন মানুষের সঙ্গে দেখা হয়েছে, যারা আমার চেয়ে অনেক বেশি হারিয়েছে। যারা গোটা পৃথিবী ভেঙে পড়তে দেখেছে। পরিবার। স্বাস্থ্য। নিরাপত্তা। প্রিয় মানুষ।

তাদের দেখে একটা গোড়ার শিক্ষা পেয়েছি। যন্ত্রণা অনিবার্যভাবে মানুষকে ধ্বংস করে না। প্রায়ই সে ধ্বংস করে নিজেকে নিয়ে মানুষটার গড়া ছবিটাকে। আর সেটা সম্পূর্ণ অন্যরকম ধ্বংস। যন্ত্রণা এলে সে আমাদের মুখোশ ছাড়া হাজির হতে বাধ্য করে। পদবি ছাড়া। ভূমিকা ছাড়া। সুরক্ষা ছাড়া। কেবল আমরা। আর যা টিকে থাকে। প্রথমে এই উন্মোচন ভয় ধরায়। তারপর তা এক ধরনের সত্য হয়ে ওঠে। কারণ আমরা অবশেষে অভিনয় করা থামাই। জীবনের এমন একটা পর্বের কথা মনে পড়ে, যখন গুরুত্বপূর্ণ বলে যা কিছু মানতাম, সব একসঙ্গে টলতে শুরু করেছিল। সেটা একটামাত্র সংকট ছিল না। সেটা ছিল একসঙ্গে এসে পড়া। যেন নিয়তি ঠিক করেছিল, সব প্রশ্ন একই মুহূর্তে সামনে রাখবে। কঠিন এক মরসুম ছিল সেটা। কিন্তু আজ আমি তাকে মুছে দিতাম না। সহজ একটা কারণে। সে আমাকে দেখিয়েছিল কোনটা আসল। বাড়িতে আগুন লাগলে তুমি কেবল যা পোড়ে তাই হারাও না। আগুনে কী টিকে থাকে, সেটাও আবিষ্কার করো। সংকটের কাজটা এই। সে জরুরিকে অপ্রয়োজনীয় থেকে আলাদা করে। প্রায় নিষ্ঠুর নিখুঁতভাবে। যাদের কেন্দ্রীয় মনে হত, তারা অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায়। যাদের প্রান্তিক মনে হত, তারা অপরিহার্য হয়ে ওঠে। যে উচ্চাশা বিশাল মনে হত, হঠাৎ তার মানে হারিয়ে যায়। ছোট জিনিসগুলো বিরাট মূল্য পেয়ে যায়। একটা আলিঙ্গন। একটা ফোন। একটা উপস্থিতি। একটা আন্তরিক কথা। জীবন আমাদের অনুমতি না নিয়েই অগ্রাধিকার সাজিয়ে দেয়। আর হয়তো সেটাই ঠিক। কারণ আমরা সত্যিই যা শিখি, তার অনেকটার জন্ম ওই ফাটলগুলো থেকে। ধারাবাহিকতা থেকে নয়। ছেদ থেকে। পিছনে তাকিয়ে বুঝি, যেদিন সব ভেঙে গেল সেদিনই সব শেষ হয়ে যায়নি।

সেদিনই অন্য কিছুর শুরু হয়েছিল। কিন্তু এই সত্যটা সঙ্গে সঙ্গে বুঝিনি। বুঝেছি পরে। অনেক পরে। ধ্বংসস্তূপ যখন ভিত হয়ে উঠতে শুরু করেছে। ক্ষত যখন দাগ হয়ে উঠতে শুরু করেছে। ভয় যখন বোঝাপড়ার জায়গা ছেড়ে দিয়েছে। একটা প্রশ্ন সময় প্রত্যেক মানুষের সামনে রাখে। আগে হোক পরে হোক। সেটা সাফল্য নিয়ে নয়। টাকা নিয়ে নয়। প্রতিপত্তি নিয়ে নয়। প্রশ্নটা অনেক সহজ। “কিছু ভেঙে গেলে তুমি কী করো?” কেউ থেমে যায়। কেউ লুকিয়ে পড়ে। কেউ পৃথিবীকে দোষ দেয়। কেউ শেখে। আমি শিখতে চেষ্টা করেছি। সব সময় ভালোভাবে নয়। সব সময় দ্রুত নয়। কিন্তু একটা জিনিস বোঝার মতো যথেষ্ট। ভেঙে পড়া গল্পের শেষ নয়। সেটা আগের মোহটার শেষ। আর এই দুইয়ের মধ্যে বিরাট তফাত। কারণ যতবার কিছু ভাঙে, ততবার কিছু একটা উন্মোচিতও হয়। চরিত্র। সম্পর্ক। সত্য। যা জরুরি। আর ধুলো যখন অবশেষে থিতিয়ে যায়, হইচই যখন আর বাতাস ভরে রাখে না, যন্ত্রণা যখন তার সবচেয়ে চড়া গলাটা হারায়, তখন একটা নীরব প্রশ্ন থেকে যায়। এটা নয়: “কেন এমন হল?” বরং: “তারপর আমি কী হয়ে উঠলাম?” ওই প্রশ্ন থেকেই পরের অধ্যায়ের জন্ম। কারণ যেদিন সব ভেঙে গেল, সেদিন কেবল কিছু একটা ধ্বংস হয়নি। সেদিন আমাকে বাধ্য করেছিল খুঁজে বের করতে, কী দাঁড়িয়ে থাকবে।


Ferdinando Frega
Gillette Man ⚔️

PDF← সম্প্রদায়ের গাথা

অন্য গাথাগুলি দেখুন

Library · Vatican · Genesis · Opera

← Return to Main