সম্প্রদায়ের গাথা · বাংলা সংস্করণ · চৌকাঠ 09
কর্তব্যের দাম
ছোটবেলায় কর্তব্য শব্দটা আমাদের কাছে কঠিন এক শব্দ বলে মনে হয়। তার মধ্যে নিয়মের শব্দ। ত্যাগের। বাধ্যবাধকতার। তাতে অভিযানের মোহ নেই। তাতে সাফল্যের রং নেই। এমনকি সুখের ভাষাও তাতে নেই। এই কারণেই কর্তব্যের স্বপ্ন প্রায় কেউ দেখে না। মানুষ স্বপ্ন দেখে ফলাফলের। লক্ষ্যের। জয়ের। স্বীকৃতির। কর্তব্য আসে পরে। নিঃশব্দে। আর বাকি সবকিছুর চেয়ে বেশিদিন থেকে যায়। বহু বছর আমিও বিশ্বাস করতাম, জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশটা দৃশ্যমান অংশ। পদোন্নতি। বদল। গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। জয়। তারপর সময় আমাকে এমন কিছু শেখাল, যা কোনো বই ব্যাখ্যা করতে পারত না। একজন মানুষের জীবন মাপা হয় না অসাধারণ দিনগুলোয়। মাপা হয় সাধারণ দিনগুলোয়। যেসব দিনে কেউ দেখছে না। যেসব দিনে যা করার তা কেবল করে যেতে হয়। এমনকি যখন ইচ্ছে করে না। এমনকি যখন আমরা ক্লান্ত। এমনকি যখন পৃথিবী যেন লক্ষই করে না। কর্তব্য সেখানেই থাকে। তার বাস ধারাবাহিকতায়। উৎসাহে নয়। আমার মনে পড়ে এমন বহু মুহূর্ত, যখন ইচ্ছা আর কর্তব্য উল্টো দিকে হেঁটেছে। এসব পরিস্থিতি সবাই চেনে। তুমি থামতে চাও। কিন্তু চালিয়ে যেতে হয়।
তুমি সরে যেতে চাও। কিন্তু কেউ তোমার উপর ভরসা করে আছে। তুমি নিজের কথা ভাবতে চাও। কিন্তু অন্য দিক থেকে দায়িত্ব ডাকে। ওই মুহূর্তে জীবন একটা সহজ ও নির্মম প্রশ্ন রাখে। কেউ যখন তোমাকে ঠিক কাজটা করতে বাধ্য করছে না, তখন তুমি কে? উত্তর আসে না কথা থেকে। আসে কাজ থেকে। তাড়াতাড়িই শিখেছিলাম, কর্তব্যের একটা দাম আছে। বেশির ভাগ মানুষ যা কল্পনা করে, তার চেয়ে অনেক বেশি। তার দাম সময়। তার দাম শক্তি। তার দাম সুযোগ। কখনও কখনও আমাদের স্বপ্নের একটা অংশও তার দাম। কারণ কোনো কিছুর পক্ষে নেওয়া প্রতিটি সিদ্ধান্তই অনিবার্যভাবে অন্য কিছুকে ছেড়ে দেওয়া। দামহীন কোনো জীবন নেই। আছে কেবল মানুষ, যারা বেছে নেয় কোন দামটা দেবে। আমি দেখেছি, কেউ কেউ কেরিয়ারের জন্য পরিবারকে বিসর্জন দিয়েছে। আর কেউ কেউ পরিবারের জন্য কেরিয়ার। দেখেছি, কেউ স্বাধীনতার নামে নিরাপত্তা ছেড়ে দিয়েছে। আর কেউ নিরাপত্তার নামে স্বাধীনতা। জীবন বিনামূল্যে পুরস্কার বিলোয় না। সে সব সময় একটা জিনিসের বদলে আরেকটা নেয়। এই বোধ পৃথিবীকে দেখার ধরন বদলে দেয়। সবচেয়ে বেশি বদলায় যখন তুমি বিচার করা থামাও। কারণ প্রতিটি সিদ্ধান্তের পিছনে একটা অদৃশ্য যুদ্ধ থাকে, যা অন্যরা দেখে না। প্রতিটি দায়িত্বের পিছনে থাকে একটা ব্যক্তিগত মূল্য। প্রতিটি আপাত সাফল্যের পিছনে প্রায়ই থাকে অজানা কিছু ত্যাগ। বছর যত গেছে, যারা নিজেদের ত্যাগের কথা বলে বেড়াত তাদের প্রতি শ্রদ্ধা তত কমেছে, আর যারা চুপচাপ সেই ত্যাগ বেঁচেছে তাদের প্রতি অনেক বেড়েছে। সত্যিকারের দায়িত্ববান মানুষ নিজের কথা বলতে ভালোবাসে না। যা তাদের উপর নির্ভর করে, সেটাকে দাঁড় করিয়ে রাখতেই তারা বড় বেশি ব্যস্ত। একটা পরিবার। একটা প্রতিষ্ঠান। একটা সমাজ।
একটা কাজ। একটা প্রতিশ্রুতি। কিছু মানুষ না চেয়েই স্তম্ভ হয়ে ওঠে। একদিন তারা ঘুরে দাঁড়িয়ে দেখে, অন্যরা তাদের উপর ভর দিয়ে আছে। সন্তানেরা। বাবা-মা। সহকর্মীরা। বন্ধুরা। ভঙ্গুর মানুষ। দিশাহারা মানুষ। স্থিরতা খুঁজতে থাকা মানুষ। তখন কর্তব্য আর তত্ত্ব থাকে না। হয়ে ওঠে রোজকার উপস্থিতি। এমন উপস্থিতি, যা সব সময় আরামের নয়। কিন্তু যা সবকিছুকে অর্থ দেয়। একটা শিক্ষার কথা মনে পড়ে, যা বুঝতে আমার বছরের পর বছর লেগেছে। কর্তব্যের জন্ম আনুগত্য থেকে নয়। তার জন্ম ভালোবাসা থেকে। এই তফাত সব বদলে দেয়। যখন তুমি কিছু ভালোবাসো, তুমি তার যত্ন নাও। যখন যত্ন নাও, তুমি দায়িত্ববান হয়ে ওঠো। যখন দায়িত্ববান হয়ে ওঠো, তুমি একটা ভার মেনে নাও। আর সেই ভার ধীরে ধীরে তোমারই অংশ হয়ে যায়। এই কারণেই জীবনের সবচেয়ে বড় কর্তব্যগুলো চাপিয়ে দেওয়া যায় না। কেবল মেনে নেওয়া যায়। কোনো আইন তোমাকে ভালোবাসতে বাধ্য করতে পারে না। কোনো নিয়ম তোমাকে পাশে থাকতে বাধ্য করতে পারে না। চলে যাওয়াই সহজ হলে কোনো কর্তৃপক্ষ তোমাকে থেকে যেতে বাধ্য করতে পারে না। এসব ভিতরের সিদ্ধান্ত। আর বাইরের যেকোনো চাপিয়ে দেওয়ার চেয়ে এদের দাম বেশি। বহুবার নিজেকে প্রশ্ন করেছি, কর্তব্য কি আমাদের সুখী করে। আজ মনে হয়, প্রশ্নটাই ভুল। কর্তব্য আমাদের সুখী করার জন্য তৈরি হয়নি। তৈরি হয়েছে আমাদের নির্ভরযোগ্য করার জন্য। সুখ আসে আর যায়।
নির্ভরযোগ্যতা থেকে যায়। আর সেটাই মানুষকে আমাদের উপর ভরসা করতে দেয়। শেষ পর্যন্ত জীবনে আমরা যা গড়ি, তার অনেকটাই এই ভরসার উপর দাঁড়িয়ে। ভরসা ছাড়া কোনো পরিবার টেকে না। ভরসা ছাড়া কোনো বন্ধুত্ব থাকে না। ভরসা ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠান বাড়ে না। ভরসা ছাড়া কোনো সম্পর্ক বাঁচে না। আর ভরসার জন্ম প্রায় সব সময় একই প্রশ্ন থেকে। “দরকারের সময় এই মানুষটা কি পাশে থাকবে?” সুবিধেমতো সময়ে নয়। সহজ সময়ে নয়। দরকারের সময়। সময়ের সঙ্গে বুঝেছি, একজন পুরুষ বা নারীর আসল দাম সবচেয়ে বেশি ফুটে ওঠে সেখানেই। ওই প্রশ্নের উত্তরে। সাফল্যে নয়। বক্তৃতায় নয়। অভিপ্রায়ে নয়। উপস্থিতিতে। নির্ভরযোগ্যতায়। ধারাবাহিকতায়। যারা থেকে যায়, তাদের নিঃশব্দ সাহসে। সবচেয়ে খারাপ দিনগুলোতেও। কর্তব্যের দাম কত? অনেক। কখনও কখনও আমাদের ইচ্ছার চেয়েও বেশি। কিন্তু ছেড়ে যাওয়ার দামের চেয়ে তা অসীম গুণ কম। কারণ মেনে নেওয়া দায়িত্বের দাম চড়া। কিন্তু ভেঙে ফেলা দায়িত্বের দাম আরও চড়া। আর সময় যখন গড়িয়ে যায়, যেমন আগে হোক পরে হোক সবার জীবনেই যায়, তখন আমরা যে আরামগুলো আগলে রেখেছিলাম সেগুলো মনে থাকে না। মনে থাকে যাদের আগলে রেখেছিলাম, সেই মানুষগুলোর কথা। যে প্রতিশ্রুতিগুলো রেখেছিলাম। যে ভারগুলো বইতে বেছে নিয়েছিলাম। আর আমরা আবিষ্কার করি, ঠিক সেখানেই, যেখানে কেবল ত্যাগ ছাড়া আর কিছু আছে বলে মনে হয়নি, লুকিয়ে ছিল আমাদের জীবনের গভীরতম অর্থ।
Ferdinando Frega
Gillette Man ⚔️