সম্প্রদায়ের গাথা · বাংলা সংস্করণ · চৌকাঠ 07
পৃথিবী ঠিকানা বদলাল
কিছু মানুষের জীবনে এমন একটা মুহূর্ত আসে, যখন ভূগোল আর মানচিত্র থাকে না, অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠে। সেদিন পর্যন্ত পৃথিবীটা থাকে বইয়ের ভিতরে। ছবির ভিতরে। অন্যদের গল্পের ভিতরে। খবরের বুলেটিনে। তারপর হঠাৎ সেটা আর খবর থাকে না, হয়ে ওঠে পাড়ি দেওয়ার রাস্তা। আমার ক্ষেত্রে এটা ঘটেছিল ধীরে ধীরে। বিশেষ কোনো সকাল ছিল না। মহাকাব্যিক কোনো ফোন কল ছিল না। জীবনকে আগে আর পরে ভাগ করে দেওয়ার মতো কোনো ঘোষণা ছিল না। ছিল শুধু একটা দরজা, যা খুলে গেল। আর সেই দরজার ওপাশে ছিল পৃথিবী। যেখানে বড় হয়েছ, সেই জায়গা ছেড়ে গেলে প্রথমেই যা হারাও, তা হল এই ভ্রম যে তোমার বাঁচার ধরনটাই স্বাভাবিক ধরন। এই ধাক্কাটা স্বাস্থ্যকর। সেই মুহূর্ত পর্যন্ত তুমি ভাবো, চারপাশে যা দেখেছ সেটাই স্বাভাবিকতা। তারপর তুমি অন্য কোথাও পৌঁছও। আর আবিষ্কার করো, আরও অনেক স্বাভাবিকতা আছে। অন্য ছন্দ। অন্য মূল্যবোধ। অন্য ভয়। অন্য আশা। আর সবগুলোরই তোমারটার সমান মর্যাদা। শুরুতে আমি দেখতাম। আমি শুনতাম। আমি বোঝার চেষ্টা করতাম। প্রতিটি দেশ যেন একই মানবিক গল্পের আলাদা একটা সংস্করণ বলছিল। ভাষা বদলাত। মুখ বদলাত। অভ্যাস বদলাত। কিন্তু প্রশ্নগুলো থাকত অবাক করা রকমের একই। পরিবার কীভাবে গড়বে? সম্মান কীভাবে অর্জন করবে? যাকে ভালোবাসো তাকে কীভাবে আগলাবে? ভবিষ্যতের মুখোমুখি কীভাবে হবে?
প্রতিবার প্রশ্নটা আলাদা হত শুধু উচ্চারণে। সারবস্তুতে কখনও নয়। মনে পড়ে সেই বিস্ময়ের বোধ, যখন এমন সব শহরে ঢুকেছি যেগুলো আগের দিন পর্যন্ত ছিল শুধু কাগজে। বিমানবন্দর। স্টেশন। হোটেল। মিটিং রুম। রেস্তোরাঁ। রাস্তা। নামহীন সব জায়গা, যেগুলো আমার জীবনের অধ্যায় হয়ে উঠল। অনেকে ভাবে, ভ্রমণ মানে জায়গা বদল। সেটা সত্যি নয়। ভ্রমণ মানে দৃষ্টিকোণ বদল। তুমি একটা মহাদেশ পেরিয়ে যেতে পারো কিছুই না শিখে। আবার একটামাত্র রাস্তা পেরিয়ে বদলে যেতে পারো। সেটা নির্ভর করে কোন চোখে দেখছ তার উপর। বছরের পর বছর ভেবেছি, আমিই পৃথিবীকে দেখছি। তারপর আবিষ্কার করলাম, পৃথিবীই আমাকে দেখছিল। প্রতিটি সংস্কৃতি আয়নার মতো কাজ করে। তুমি যা, তার একটা আলাদা ছবি সে ফিরিয়ে দেয়। কিছু দেশে আমি ধৈর্য শিখেছি। অন্য কিছুতে মানিয়ে নেওয়া। আরও কিছুতে শৃঙ্খলা। প্রতিটি জায়গা আমার হাতে এমন এক শিক্ষা তুলে দিয়েছে, যা শিখতে হবে তা আমি জানতাম না। আর প্রতিবার আমার ভিতরে এমন কিছু রেখে গেছে, যা আগে ছিল না। দীর্ঘদিন বিদেশে থাকলে একটা কৌতূহলজনক ব্যাপার ঘটে। “বাড়ি” শব্দটার মানে বদলে যায়। সেটা আর কোনো ঠিকানার সঙ্গে মেলে না। সেটা আর কোনো শহরের সঙ্গে মেলে না। কখনও কোনো দেশের সঙ্গেও মেলে না। সেটা আরও চলমান কিছু হয়ে ওঠে। আরও গভীর। সংজ্ঞায়িত করা আরও কঠিন।
বাড়ি হয়ে ওঠে তাই, যা তুমি সঙ্গে বইতে পারো। নীতিগুলো। স্মৃতিগুলো। যাদের ভালোবাসো, তারা। যে গল্পগুলো তুমি বলে যাও। বাকি সব বদলে যেতে পারে। আমি নানা দেশে যথেষ্ট দিন কাটিয়েছি বলে একটা সহজ সত্য বুঝেছি। মানুষ যা ভয় পায়, তার সঙ্গেই তাদের মিল অনেক বেশি। তারা ভয় পায় বিস্মৃত হওয়ার। তারা ভয় পায় প্রিয়জনদের হারানোর। তারা ভয় পায় ব্যর্থ হওয়ার। তারা ভয় পায় যন্ত্রণার। তারা ভয় পায় সময়কে। এই সর্বজনীন ভয়গুলোর উপরেই আমাদের অস্তিত্বের অনেকটা গড়ে ওঠে। আর ঠিক সেখানেই জন্ম নেয় সবচেয়ে খাঁটি সংযোগগুলোও। পার্থক্যে নয়। ভাগ করে নেওয়া ভঙ্গুরতায়। প্রতিবার দেশ বদলানোর সময় আমি কিছু ফেলে এসেছি। বন্ধু। অভ্যাস। নিশ্চয়তা। প্রতিবারই আমি অন্য কিছু পেয়েছি। নতুন দৃষ্টিকোণ। নতুন সম্পর্ক। নতুন প্রশ্ন। চূড়ান্ত হিসাবটা কখনও অর্থনৈতিক ছিল না। সেটা ছিল মানবিক। যত বছর গেছে তত বুঝেছি, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা মানে পাসপোর্টে সিলমোহর জমানো নয়। সেটা মানে ভিতরের সীমানাগুলো চওড়া করা। কম অনমনীয় হয়ে ওঠা। নিজের নিশ্চয়তা নিয়ে কম নিশ্চিত হওয়া। আরও কৌতূহলী। শুনতে আরও রাজি।
পৃথিবী প্রায়ই তাদের পুরস্কার দেয়, যারা বলে। জীবন, উল্টোদিকে, তাদের পুরস্কার দেয় যারা শুনতে জানে। আর ভিন্ন সংস্কৃতির কথা শোনা হল সবচেয়ে কার্যকর শিক্ষাগুলোর একটা। এক পর্যায়ে আমি দেশ গোনা বন্ধ করলাম। আমি ফ্লাইট গোনা বন্ধ করলাম। আমি পেরোনো মাইল গোনা বন্ধ করলাম। বুঝলাম, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দূরত্বটা ভৌগোলিক নয়। সেটা মানসিক। যে দূরত্ব পূর্বধারণাকে বোঝাপড়া থেকে আলাদা রাখে। অজ্ঞতাকে জ্ঞান থেকে। ভয়কে আস্থা থেকে। প্রতিটি অভিজ্ঞতা সেটা কমাতে সাহায্য করেছে। শেষে এমন কিছু বুঝিয়ে দিয়েছে, যা আমি আঁচ করিনি। পৃথিবী শুধু আমার চারপাশে বদলাচ্ছিল না। সে বদলাচ্ছিল আমার ভিতরে। বছর কয়েক আগে যে মানুষটা বেরিয়ে পড়ে ছিল, সে আর ছিল না। তার জায়গায় ছিল এমন কেউ, যে জিনিসগুলো নানা কোণ থেকে দেখতে শিখেছে। ঠিক প্রমাণিত হওয়ায় কম আগ্রহী, বোঝায় বেশি আগ্রহী এমন কেউ। পার্থক্যের প্রতি কম আকৃষ্ট, মিলের প্রতি বেশি মনোযোগী এমন কেউ। শেষমেশ বুঝলাম, সবচেয়ে বড় বদলটা এক দেশ থেকে আরেক দেশে যাওয়া ছিল না। সেটা ছিল সংকীর্ণ দৃষ্টি থেকে প্রশস্ত দৃষ্টিতে যাওয়া। যেন আমার ভিতরের ঠিকানাটাই বদলে গেছে। চিরতরে। তাই এই চৌকাঠ দেশের কথা বলে না। মানচিত্রের কথা বলে না। সীমান্তের কথা বলে না। সে বলে রূপান্তরের কথা। কারণ এমন একটা মুহূর্ত আসে, যখন পৃথিবী শুধু ভূগোল বদলায় না। সে মানে বদলায়। আর যখন সেটা ঘটে, তখন আর তুমি পৃথিবীকে খোঁজো না। পৃথিবীই তোমার ভিতরে বাস করতে শুরু করে। পৃথিবী ঠিকানা বদলেছিল। আর নতুন ঠিকানাটা ছিলাম আমি।
Ferdinando Frega
Gillette Man ⚔️