আমাকে কেউ প্রত্যাশা করেনি

সম্প্রদায়ের গাথা · বাংলা সংস্করণ  ·  চৌকাঠ 02

আমাকে কেউ প্রত্যাশা করেনি


দূর থেকে একটা জীবন দেখলে সবকিছুরই মানে আছে বলে মনে হয়। বিন্দুগুলো জুড়ে যায়। ঘটনাগুলো ব্যাখ্যা পায়। মোড় গুলো অনিবার্য মনে হয়। এমনকি ভুলগুলোকেও একটা নকশার অংশ মনে হয়। কিন্তু এ এক বিভ্রম, যা বর্তমানের সম্পত্তি। যখন তুমি জিনিসগুলো বেঁচে চলেছ, তখন কোনো মানচিত্র থাকে না। থাকে শুধু দিনগুলো। আর দিনগুলোর ভিতরে কোনো ব্যাখ্যা থাকে না। থাকে সিদ্ধান্ত। ছোটবেলায় ভাবতাম, বড় রা জানে তারা কী করছে। ভাবতাম, শিক্ষকরা তাঁদের ছাত্রদের ভবিষ্যৎ জানেন। ভাবতাম, কোম্পানিগুলো মানুষের সম্ভাবনা চিনতে জানে। ভাবতাম, পৃথিবীর একটা নিয়ম আছে। তারপর অনেক সহজ একটা সত্য আবিষ্কার করলাম। আসলে কেউ জানে না কী হবে। সবাই হাতড়ে চলছে। কেউ কেউ তা স্বীকার করে। অন্যরা ভান করে, যেন তেমনটা নয়। আমার জীবনের দিকে তাকিয়ে এমন কোনো মুহূর্ত আমি চিহ্নিত করতে পারি না, যখন কেউ বলেছিল: “এই ছেলেটা অনেক দূর যাবে।” আমার জন্য কেউ অপেক্ষা করছিল না। কোনো দ্রুতগামী লেন ছিল না। আগে থেকে তৈরি কোনো নকশা ছিল না। আমি কারও প্রিয়পাত্র ছিলাম না। আর সত্যি বলতে, এই আবিষ্কার আমাকে মুক্তি দিয়েছিল। কারণ কেউ যখন তোমার কাছে কিছু আশা করে না, তখন তুমি অন্যের প্রত্যাশা মেলানোর জন্য বাঁচা ছেড়ে দাও। তুমি নিজের পথ গড়তে শুরু করো। এক পা করে। অনেকে সারা জীবন কাটিয়ে দেয় অন্যদের গড়া নিজের একটা ছবির যোগ্য হয়ে উঠতে গিয়ে। আমার একটা আলাদা সুবিধা ছিল।

সেই ছবিটাই ছিল না। এই কারণেই অনিশ্চয়তার সঙ্গে বাঁচতে শিখেছিলাম তাড়াতাড়ি। জিনিস বদলে গেলে ভয় না পেতে। পরিবর্তনকে হুমকি না ভাবতে। প্রচলিত নয় এমন পথকে ভুল বলে না ধরতে। জীবন কখনও আমার পরিকল্পনা মেনে চলার ঝামেলা নেয়নি। আর সময়ের সঙ্গে আমিও শিখেছি, সেই দাবি না করতে। এমন সময় এসেছে যখন সবকিছু ঠিক দিকে যাচ্ছে বলে মনে হয়েছে। আর এমন সময়ও, যখন ঠিক উল্টোটা ঘটছে বলে মনে হয়েছে। যেসব মানুষকে অপরিহার্য মনে হয়েছিল, তারা মিলিয়ে গেছে। যেসব সুযোগ নির্ণায়ক মনে হয়েছিল, সেগুলো অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেছে। যেসব রাস্তা গৌণ মনে হয়েছিল, সেগুলো কেন্দ্রে চলে এসেছে। আকস্মিক কিছু সাক্ষাৎ পরের বছরগুলোর গতিপথ বদলে দিয়েছে। সত্যি হলো, ভবিষ্যৎ চমকে দিতে ভালোবাসে। সে অনুমতি চায় না। আগাম খবর পাঠায় না। পদমর্যাদা মানে না। সে শুধু এসে পড়ে। আর প্রায়ই আসে সেদিক থেকে, যেদিকে কেউ তাকিয়ে নেই। আমার অস্তিত্বকে যেসব জিনিস সংজ্ঞায়িত করেছে, তার অনেকগুলোরই জন্ম এভাবে। বাঁকা পথ থেকে। দুর্ঘটনা থেকে। এমন সব ঘটনা থেকে, যেগুলো ঘটার মুহূর্তে মোটেও বিরাট কিছু মনে হয়নি। সময় আমাকে বেশ কঠোরভাবে যে শিক্ষাটা দিয়েছিল, মনে আছে। অনুমেয়তাকে মূল্যের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা চলবে না। যা অনুমেয়, তা ভরসা দেয়। যার মূল্য আছে, তা বদলে দেয়। দুটো খুব কমই মেলে। বছরের পর বছর বাজার, কোম্পানি, সংখ্যা, সংগঠন দেখে কাজ করেছি। সব জায়গায় একই বিশ্বাস পেয়েছি। যে সবকিছু আগাম বলা সম্ভব।

যে বাস্তবতাকে শাসন করা যায়। যে ভবিষ্যৎ একটা আঁকা যায় এমন রেখা। তারপর কিছু একটা এসে সব সময় সেই নিশ্চয়তা ভেঙে দিত। একটা পরিবর্তন। একটা সংকট। একজন মানুষ। একটা অসুখ। একটা ক্ষতি। একটা সুযোগ। এমন কিছু, যা কেউ পরিকল্পনায় রাখেনি। অথচ ঠিক সেখান থেকেই গল্পের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশটা শুরু হতো। কারণ জীবন আগাম বলার ক্ষমতা মাপে না। সে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা মাপে। এই পার্থক্যটা মৌলিক। আগাম বলা বুদ্ধির অনুশীলন। মানিয়ে নেওয়া পরিচয়ের অনুশীলন। পৃথিবী বদলালে যে ঠিক ছিল, সে জেতে না। জেতে সেই, যে পরিবর্তনের ভিতরে বেঁচে থাকতে পারে। মাঝে মাঝে ভাবি, কেউ যদি আমাকে ঠিক করে বলে দিত আমার পথটা কীভাবে খুলবে, তাহলে কী হতো। হয়তো কম ভয় পেতাম। হয়তো কম ভুল করতাম। হয়তো কম কষ্ট পেতাম। কিন্তু তারপরই বুঝি, শিখতাম অনেক কম। কারণ যেসব জিনিসকে আমি গুরুত্বপূর্ণ মনে করি, তার বেশিরভাগেরই জন্ম নিশ্চয়তা থেকে নয়। জন্ম সংশয় থেকে। ঝুঁকি থেকে। নিশ্চয়তার অভাব থেকে। ঠিক কোথায় যাচ্ছি না জেনেই এগিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন থেকে। এই অর্থে, প্রত্যাশিত না হওয়াটা ছিল একটা সৌভাগ্য। এটা আমাকে গড়তে বাধ্য করেছিল। দেখতে।

শিখতে। বদলাতে। আবার শুরু করতে। প্রতিবার। বারবার। আজ অনেকে অনুমোদনের পিছনে ছোটে। তারা ছাড়পত্রের অপেক্ষা করে। তারা সমর্থন খোঁজে। তারা আগে থেকে জানতে চায়, তাদের মেনে নেওয়া হবে কি না। তাদের স্বীকৃতি দেওয়া হবে কি না। তাদের বোঝা হবে কি না। আমি কোনো সূত্র দিতে পারি না। আমি শুধু বলতে পারি, আমি কী শিখেছি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পৃথিবী জানেই না যে তুমি আছ। সে তোমার অপেক্ষা করে না। সে তোমার জন্য রাস্তা তৈরি করে না। সে বরণডালা সাজায় না। আর হয়তো এটাই ভালো। কারণ একটা পথের মূল্য নির্ভর করে না কে সেটা আগাম দেখেছিল তার উপর। নির্ভর করে কার সেটা পেরোনোর সাহস ছিল তার উপর। আমাকে কেউ প্রত্যাশা করেনি। আমার জন্য কেউ অপেক্ষা করছিল না। আমি কারও পরিকল্পনায় ছিলাম না। অথচ আমি এখানে। পিছন ফিরে তাকিয়ে। বিন্দুগুলো জুড়ে। সময়ের পরিহাসে হেসে। কারণ শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে আকর্ষণীয় গল্পগুলো আগে থেকে লেখা গল্প নয়। সেগুলো সেই গল্প, যারা নিজেরাই অস্তিত্বের পথ খুঁজে নেয়। আর আমার গল্পটা, ভালো বা মন্দ, এই দলেরই।


Ferdinando Frega
Gillette Man ⚔️

PDF← সম্প্রদায়ের গাথা

অন্য গাথাগুলি দেখুন

The Corpus · Maps · Library · Vatican · One Door · Genesis · Opera · Wood · Contact

← Return to Main