নারীরাই আগে দেখেছিল

সম্প্রদায়ের গাথা · বাংলা সংস্করণ  ·  চৌকাঠ 06

নারীরাই আগে দেখেছিল


কিছু সত্য আসে পড়াশোনার ভিতর দিয়ে। কিছু আসে অভিজ্ঞতার ভিতর দিয়ে। আর তারপর আছে সেইসব, যেগুলো মেনে নেওয়া সবচেয়ে কঠিন। যেগুলো আমাদের আগেই অন্যরা দেখে ফেলে। বহুদিন আমি ভেবেছি, পর্যবেক্ষক আমিই। যে পেশাদার বিশ্লেষণ করে। যে মানুষ মূল্যায়ন করে। যে চারপাশের ঘটনাগুলোর মানে বার করে। আমি ভুল ছিলাম। পিছনে তাকিয়ে দেখি, আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু ব্যাপার পথে দেখা-হওয়া নারীরাই আগে বুঝেছিল। তারা বেশি শিক্ষিত ছিল বলে নয়। তারা বেশি ভাগ্যবান ছিল বলে নয়। তাদের কাছে এমন তথ্য ছিল বলে নয়, যা আমার জানা ছিল না। নিছক এই কারণে যে, তারা দেখতে পেত। অন্যভাবে। আরও দ্রুত। আরও গভীরে। কম অন্যমনস্ক হয়ে। পুরুষরা প্রায়ই ফলাফলে মুগ্ধ হয়। নারীরা, অনেক বেশিবার, ইঙ্গিতগুলো লক্ষ করে। পুরুষ দেখে দিকটা। নারী দেখে নড়াচড়াটা। পুরুষ শোনে শব্দগুলো। নারী শোনে, শব্দগুলো কী বলা এড়িয়ে যাচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই সবসময় এমন নয়। কিন্তু যথেষ্ট বারই এমন, যাতে খেয়াল করা দরকার। পেশাগত জীবনে আমি অসাধারণ নারীদের দেখা পেয়েছি। ম্যানেজার। সহকর্মী। ক্রেতা। কর্তা। মা। মেয়ে।

বন্ধু। অনেকে এসেছিল ভিন্ন ভিন্ন দেশ থেকে। ভিন্ন ভাষা। ভিন্ন সংস্কৃতি। তবু তাদের একটা অভিন্ন বৈশিষ্ট্য ছিল। মানুষ নিজেকে বোঝার আগেই তারা মানুষকে বুঝে ফেলত। প্রথমে আমি এই ক্ষমতাটাকে ভেবেছি সহজাত বোধ। সময়ের সঙ্গে একে বলেছি মানবিক অভিজ্ঞতা। কারণ অনেকে যখন তথ্য দেখত, তারা দেখত মানুষগুলোকে। আর মানুষ সবসময়ই তথ্যের আগে চলে। সংখ্যায় যা ঘটে, তা প্রায় সবসময় মানুষের ভিতরেই শুরু হয়। আমার পথ বদলে দেবে এমন অনেক পরিবর্তন আমার আগে কোনো নারী চিহ্নিত করেছিল। কখনও তা ছিল ছোট ছোট খুঁটিনাটি। একটা বাক্য। একটা নীরবতা। একটা দুশ্চিন্তা। আপাতদৃষ্টিতে গৌণ একটা মন্তব্য। জমকালো কিছু নয়। নাটকীয় কিছু নয়। তবু, মাস বা বছর পরে, সেই কথাগুলো ফিরে এসেছে। আর সেগুলো ঠিক ছিল। সময়ের সঙ্গে আমি শুনতে শিখেছি। সৌজন্যের খাতিরে নয়। বুদ্ধির খাতিরে। কারণ পৃথিবীটা একটা মাত্র দৃষ্টিকোণ থেকে বোঝার পক্ষে বড় বেশি জটিল। প্রতিটি মানুষ রাস্তার একটা অংশ দেখে। পুরো মানচিত্র কেউ দেখে না। আমার জীবন দিয়ে যে নারীরা গেছে, তারা আমাকে এমন কিছু শিখিয়েছে যা কোনো কোম্পানি শেখাতে পারত না। যে সম্পর্ক আসে লেনদেনের আগে। সবসময়। একটা চুক্তি সমঝোতা তৈরি করতে পারে। একটা সম্পর্ক আস্থা তৈরি করতে পারে। আর চুক্তি যখন আর যথেষ্ট থাকে না, আস্থা তখনও টিকে থাকে।

আমি দেখেছি অত্যন্ত ক্ষমতাবান মানুষ আস্থার অভাবে সব হারিয়েছে। আর আপাতভাবে ভঙ্গুর মানুষ আস্থার জোরে পৃথিবী গড়েছে। আমার গল্পে থাকা নারীদের কথা ভাবলে আমি ভূমিকাগুলোর কথা ভাবি না। আমি ভাবি অদৃশ্য অবদানগুলোর কথা। স্বীকৃতি না পেয়েও তারা যা যোগ করেছে, তার কথা। বাস্তবের আলাদা আলাদা অংশ একসঙ্গে ধরে রাখার ক্ষমতার কথা। পরিবার। কাজ। সম্পর্ক। ক্ষতগুলো। আশাগুলো। অনেক পুরুষ জীবনকে দেখে লক্ষ্যের একটা সারি হিসেবে। অনেক নারী দেখে সংযোগের একটা জাল হিসেবে। হয়তো সেজন্যই তারা প্রায়ই কিছু সিদ্ধান্তে আগে পৌঁছয়। তারা বন্ধনগুলো দেখে। তারা প্রভাবগুলো দেখে। তারা পরিণামগুলো দেখে। আমার জীবনের এমন একটা সময় মনে পড়ে, যখন আমার বিশ্বাস ছিল সবকিছু আমাকে একাই সামলাতে হবে। এটা পুরুষদের মধ্যে ছড়িয়ে থাকা এক রোগ। ভাবা যে শক্তি মানেই স্বয়ংসম্পূর্ণতা। ভাবা যে সাহায্য চাওয়া দুর্বলতা। ভাবা যে ভঙ্গুরতা একটা ত্রুটি। নারীরাই সেই বিশ্বাস ভেঙে দিয়েছিল। বড় বড় বক্তৃতা দিয়ে নয়। উদাহরণ দিয়ে। আমাকে দেখিয়ে যে সত্যিকারের শক্তি সব বয়ে নেওয়ায় নেই। সে শক্তি এমন বন্ধন গড়ায়, যা যথেষ্ট মজবুত বলে সব একা বইতে হয় না। এ ছিল এক বৈপ্লবিক আবিষ্কার। কারণ এটা বদলে দিয়েছিল পৃথিবীকে দেখার ধরন। আর বদলে দিয়েছিল নিজেকে দেখার ধরন। প্রতিটি সংস্কৃতিরই সাফল্যের নিজস্ব সংজ্ঞা আছে। পদবি। পদমর্যাদা।

টাকা। মর্যাদা। সময়ের সঙ্গে শিখেছি, আরেকটা মাপকাঠি আছে। যারা থেকে যায়, সেই মানুষগুলো। যখন পাওয়ার কিছু নেই, তখনও যারা পাশে থাকে। তুমি নিজেই যখন নিজেকে বিশ্বাস করতে পারছ না, তখনও যারা তোমাকে বিশ্বাস করে যায়। তোমার ভালো দিকটা প্রকাশ পাওয়ার আগেই যারা তা দেখতে পায়। আমার জীবনে এই ভূমিকা পালন করা মানুষদের অনেকেই ছিল নারী। আর এই বাস্তবটা উপেক্ষা করা অসম্ভব। বইগুলো প্রায়ই নায়কদের উদযাপন করে। জীবনী উদযাপন করে মুখ্য চরিত্রদের। বাস্তব জীবন অনেক বেশি সৎ। প্রতিটি পথের পিছনে এমন মানুষ আছে, যারা সেটা গড়তে সাহায্য করেছে। যারা শিরোনামে আসে না। যারা স্বীকৃতি খোঁজে না। যারা সম্ভব করে তোলে সেটা, যেখানে অন্যরা সই করে। আমার গল্পে দিয়ে যাওয়া নারীদের কথা ভাবলে আমি ঠিক এটাই ভাবি। তাদের দেখতে পাওয়ার ক্ষমতার কথা। বোঝার। পাশে দাঁড়ানোর। শুধরে দেওয়ার। আগেভাগে টের পাওয়ার। আর সবচেয়ে বড় কথা, একটা সহজ সত্য মনে করিয়ে দেওয়ার। কেউ সত্যিই একা কিছু গড়ে না। আমরা একটা কাজে সই করতে পারি। আমরা ছবিতে থাকতে পারি। আমরা একটা গল্প বলতে পারি। কিন্তু প্রতিটি গল্পের পিছনে সবসময় একটা অদৃশ্য সমাজ থাকে। আমার ক্ষেত্রে, সেই সমাজের একটা বড় অংশের মুখ ছিল নারীর। তাই এই চৌকাঠের শিরোনাম কোনো উসকানি নয়। এটা একটা স্বীকারোক্তি। কারণ বহুবার, কী ঘটছে তা আমি বোঝার অনেক আগেই, তারা বুঝে ফেলেছিল। নারীরাই আগে বুঝেছিল।


Ferdinando Frega
Gillette Man ⚔️

PDF← সম্প্রদায়ের গাথা

অন্য গাথাগুলি দেখুন

The Corpus · Maps · Library · Vatican · One Door · Genesis · Opera · Wood · Contact

← Return to Main