কোম্পানি ছিল কেবল শুরু

সম্প্রদায়ের গাথা · বাংলা সংস্করণ  ·  চৌকাঠ 04

কোম্পানি ছিল কেবল শুরু


বহু বছর আমি বিশ্বাস করতাম আমি একটা কেরিয়ার গড়ছি। বিশ্বাসটা যুক্তিসঙ্গত ছিল। প্রতিদিন সকালে কাজের জন্য উঠতাম। প্রতি সপ্তাহে লক্ষ্য থাকত। প্রতি মাসে ফলাফল থাকত। প্রতি বছরে একটা হিসাব থাকত। সবকিছুই যেন এই ধারণাটাকে সায় দিত যে গল্পের কেন্দ্রে আছে কাজ। তারপর সময় এল। আর সময়, বরাবরের মতোই, সবকিছুকে তার জায়গায় বসানোর দায়িত্ব নিল। আজ পিছন ফিরে তাকিয়ে সংখ্যাগুলোর চেয়ে বেশি মনে পড়ে মানুষগুলোকে। পরিসংখ্যানের চেয়ে বেশি মনে পড়ে কথোপকথনগুলো। পদ্ধতির চেয়ে বেশি মনে পড়ে সিদ্ধান্তগুলো। এ এক আশ্চর্য আবিষ্কার। আমরা সারা জীবন বিশ্বাস করে কাটাই যে মূল্য থাকে কাঠামোর ভিতরে। তারপর আবিষ্কার করি, মূল্যটা লুকিয়ে ছিল সেই মানুষগুলোর ভিতরে, যারা ওই কাঠামোগুলোর ভিতর দিয়ে গেছে। আমি এমন এক জগতে ঢুকেছিলাম যার নিয়ম ছিল নির্দিষ্ট। স্পষ্ট লক্ষ্য। উঁচু মান। সে শৃঙ্খলা দাবি করত। সে দায়িত্ব চাইত। সে শর্ট কাটের জন্য বেশি জায়গা দিত না। পরিবেশটা ছিল কঠিন। আর সেটাই ছিল সৌভাগ্য। কারণ শৃঙ্খলা এক ধরনের শ্রদ্ধা। সবার আগে নিজের প্রতি। আমরা এমন এক যুগে বাঁচি যা অনবরত প্রতিভার জয়গান করে। আমি অন্য একটা জিনিসকে শ্রদ্ধা করতে শিখেছি। নিষ্ঠা। প্রতিভা একটা দরজা খুলে দিতে পারে। নিষ্ঠা তোমাকে করিডোরটা পেরোতে দেয়। অনেক উজ্জ্বল মানুষ হারিয়ে যায়। অনেক সাধারণ মানুষ বরং অসাধারণ কাজ গড়ে তোলে। পার্থক্যটা খুব কমই বুদ্ধির। প্রায়ই সেটা ধারাবাহিকতার।

দিনের পর দিন। সিদ্ধান্তের পর সিদ্ধান্ত। দায়িত্বের পর দায়িত্ব। সেখানেই আমি মৌলিক একটা জিনিস বুঝতে শুরু করি। কোনো সংগঠন আসলে কখনও দালান দিয়ে তৈরি নয়। সেটা লোগো দিয়ে তৈরি নয়। সেটা স্লোগান দিয়ে তৈরি নয়। সেটা তৈরি সময়ের সঙ্গে বারবার করা আচরণ দিয়ে। প্রত্যেক কোম্পানির একটা দৃশ্যমান সংস্কৃতি থাকে, আর একটা অদৃশ্য। প্রথমটা দেখা যায় ব্রোশিওরে। দ্বিতীয়টা বেরিয়ে আসে যখন কেউ দেখছে না। যখন একটা সমস্যা আসে। যখন একজন খদ্দের অসন্তুষ্ট। যখন একটা ফল আসে না। যখন সংকট দরজায় কড়া নাড়ে। ঠিক সেই মুহূর্তেই তুমি বুঝতে পারো, আসলে কীসের দাম আছে। বছরের পর বছর আমি চাপের নিচে নারী-পুরুষদের দেখেছি। কেউ কেউ পুরোপুরি বদলে গেছে। কেউ কেউ নিজেদের সেরাটা বের করে এনেছে। আর ওই মুহূর্তগুলোতেই আমি শিখেছি। সাফল্য থেকে নয়। প্রতিক্রিয়া থেকে। কারণ একজন মানুষের আসল পরিচয় সহজ দিনে খুব কমই বেরিয়ে আসে। সেটা প্রকাশ পায় যখন কিছু একটা ভেঙে যায়। যখন পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়। যখন নিরাপত্তা মিলিয়ে যায়। যখন শুধু চরিত্রটাই পড়ে থাকে। আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাগুলোর অনেকই কোনো শ্রেণিকক্ষ থেকে আসেনি। কোনো বই থেকে আসেনি। এসেছে রোজকার দেখাসাক্ষাৎ থেকে। সহকর্মীদের কাছ থেকে। খদ্দেরদের কাছ থেকে। এমন মানুষদের কাছ থেকে, যারা সম্ভবত কখনও ভাবেইনি যে তারা কিছু শেখাচ্ছে। জীবন প্রায়ই এভাবেই চলে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষকরা নিজেদের শিক্ষক বলে পরিচয় দেয় না। তারা শুধু আমাদের সামনে বেঁচে থাকে। আর তাদের কিছু একটা থেকে যায়। বছর যেতে যেতে আমি ভ্রমণ শুরু করলাম। ভিন্ন ভিন্ন দেশ। ভিন্ন সংস্কৃতি। ভিন্ন ভাষা। প্রথমে আমি পার্থক্য খুঁজতাম। স্বাভাবিক ছিল। প্রতিটা দেশের যেন নিজস্ব একটা ব্যক্তিত্ব ছিল। একটা ছন্দ। একটা যুক্তি। একটা বোধ। তারপর কিছু একটা ঘটল। আমি মিলগুলো লক্ষ করতে শুরু করলাম। সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকা একজন বাবা। নিজেকে বিসর্জন দিতে প্রস্তুত একজন মা। নিজেকে প্রমাণ করতে ব্যাকুল একজন তরুণ। সম্মান চাইছে এমন একজন শ্রমিক। একজন বৃদ্ধ, যিনি চান কেউ তাঁর কথা শুনুক। স্থানাঙ্ক বদলাত। মানুষটা আশ্চর্যরকম একই থাকত। তখনই আমি বুঝতে শুরু করলাম, কোম্পানিটা নিছক একটা কাজের জায়গার চেয়ে অনেক বেশি কিছু। সেটা ছিল একটা জানালা। সেটা আমাকে পৃথিবী দেখতে দিচ্ছিল। এমন সব বাস্তবতায় ঢুকতে দিচ্ছিল, যেগুলো নইলে কোনোদিন জানতাম না। বুঝতে দিচ্ছিল, ভূগোল মানুষকে তারা যতটা ভাবে তার চেয়ে অনেক কম আলাদা করে। প্রতিটা সফর কিছু যোগ করত। প্রতিটা সাক্ষাৎ মনের একটা সীমানা সরিয়ে দিত। প্রতিটা অভিজ্ঞতা একটা কুসংস্কার ভেঙে দিত। আর না বুঝেই আমি কাজের চেয়েও বড় একটা শিক্ষা নিচ্ছিলাম। মানুষ প্রতিটা ব্যবস্থার আগে আসে। সব সময়। কৌশল বদলায়।

বাজার বদলায়। প্রযুক্তি বদলায়। প্রজন্ম বদলায়। কিন্তু আস্থা থেকে যায়। শ্রদ্ধা থেকে যায়। দেওয়া কথা থেকে যায়। এগুলো এমন মুদ্রা, যার দাম কখনও কমে না। জীবনের ওই সময়টার কথা ভাবলে আমি সেটাকে শুধু একটা পেশাগত পথ বলে মনে করি না। আমি সেটাকে মনে করি একটা মানবিক শিক্ষানবিশি। একটা গবেষণাগার। একটা অনানুষ্ঠানিক স্কুল, যেখানে প্রতিদিন পৃথিবীকে বোঝার সঙ্গে একটা করে খুঁটিনাটি যোগ হতো। এই কারণেই আজ আমি হাসি, যখন কেউ একটা কেরিয়ারকে কতগুলো পদের তালিকায় নামিয়ে আনে। পদ সাময়িক। শিক্ষাগুলো থেকে যায়। মানুষগুলো থেকে যায়। রূপান্তরগুলো থেকে যায়। শেষ পর্যন্ত আমি সঙ্গে নিয়ে চলি না কোনো সংগঠন-ছক। সঙ্গে নিয়ে চলি না কোনো পদ। সঙ্গে নিয়ে চলি না কোনো খেতাব। আমি সঙ্গে নিয়ে চলি শত শত মুখ। হাজার হাজার কথোপকথন। সাধারণ মানুষের কাছ থেকে পাওয়া অগণিত শিক্ষা। আর সবচেয়ে বড় কথা, একটা নিশ্চয়তা। কোম্পানিটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সে আমাকে গড়েছে। সে আমাকে পরীক্ষায় ফেলেছে। সে আমার জন্য এমন সব পথ খুলে দিয়েছে, যা আমি কল্পনাও করতে পারতাম না। কিন্তু সেটা ছিল না শেষ রেখা। সেটা ছিল শুরুর বিন্দু। কারণ কাজ গড়েছে দক্ষতা। পৃথিবী গড়েছে বোধ। আর আসল গল্পটা, যেটা আমার ভিতরে ধীরে ধীরে আকার নিচ্ছিল, তখনও শুরুই হয়নি।


Ferdinando Frega
Gillette Man ⚔️

PDF← সম্প্রদায়ের গাথা

অন্য গাথাগুলি দেখুন

The Corpus · Maps · Library · Vatican · One Door · Genesis · Opera · Wood · Contact

← Return to Main