তিনটি ব্লেড। এক রক্ত

সম্প্রদায়ের গাথা · বাংলা সংস্করণ  ·  চৌকাঠ 01

তিনটি ব্লেড। এক রক্ত


আমার দাদু জানতেন না যে একদিন কেউ তাঁকে নিয়ে লিখবে। আমার বাবা জানতেন না যে একদিন কেউ তাঁর কিছু সিদ্ধান্তের অর্থ খুঁজে বেড়াবে। আমি নিজে বহুদিন পর্যন্ত জানতামই না যে একটা গল্প আছে। ভাবতাম, শুধু দিনগুলোই আছে। সাধারণ দিন। পার করে দেওয়ার দিন। কাজ, সমস্যা, খদ্দের, দায়িত্ব, ফোন, সফর, রাখা প্রতিশ্রুতি আর ঝুলে থাকা প্রতিশ্রুতি দিয়ে তৈরি দিন। পৃথিবীর লক্ষ লক্ষ মানুষের মতোই। বড় গল্পগুলো প্রায় সব সময়ই ভুলভাবে বলা হয়। সেগুলো শুরু হয় শেষ থেকে। সেগুলো ফলটা দেখায়। সাফল্য জাহির করে। জীবনকে বানিয়ে ফেলে একটা সরলরেখা, যা অবধারিতভাবে এক বিন্দু থেকে আরেক বিন্দুতে নিয়ে যায়। বাস্তব এভাবে চলে না। বাস্তব হলো একগুচ্ছ অদৃশ্য উত্তরণ। কেউ দেখে না সেই মুহূর্তটা, যখন একজন বাবা না বুঝেই একটা শিক্ষা দিয়ে ফেলেন। কেউ দেখে না সেই মুহূর্তটা, যখন একজন ছেলে সেটা ধরে রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। কেউ দেখে না সেই মুহূর্তটা, যখন একটা নীতি এক প্রজন্ম পেরিয়ে আরেক প্রজন্মের খোঁজে বেরোয়। অথচ ঠিক সেখানেই জন্ম নেয় সেই গল্পগুলো, যেগুলো টিকে থাকে। আলোর নিচে নয়। নীরবতায়। বহু বছর ধরে আমি ভাবতাম, আমার পরিবারের তিন প্রজন্মের সঙ্গে Gillette-এর বন্ধনটা নেহাতই একটা পেশাগত কাকতালীয় ব্যাপার। একটা কোম্পানি। একটা চাকরি। একটা কেরিয়ার। আর দশটা পথের মতো একটা পথ। তারপর সময় যা সবচেয়ে ভালো পারে, তাই করতে শুরু করল। সে বিন্দুগুলো জুড়ে দিল।

ঘটে যাওয়ার সময় যেসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন মনে হয়, সে সেগুলোকে একসঙ্গে আনল। সে গড়ে তুলল এক অদৃশ্য জ্যামিতি। আর ধীরে ধীরে আমি বুঝলাম, আসল নায়ক কোম্পানি নয়। আসল নায়ক ধারাবাহিকতা। কারণ ব্র্যান্ড বদলাতে পারে। বাজার বদলাতে পারে। পণ্য বদলাতে পারে। এমনকি পৃথিবীও বদলাতে পারে। কিন্তু কিছু মূল্যবোধ আছে, যারা অনুমতি না চেয়েই সবকিছু পেরিয়ে যায়। শৃঙ্খলা। দেওয়া কথা। দায়িত্ব। যে মর্যাদা নিয়ে মানুষ কাজের মুখোমুখি হয়। এই ধারণা যে নিজের নামের দাম নিজের পদের চেয়ে বেশি। এসব হিসাবের খাতায় থাকে না। জীবনবৃত্তান্তে থাকে না। খবরের কাগজের শিরোনাম বানায় না। কিন্তু এগুলোই সেই অদৃশ্য ভিত, যার উপর একটা জীবন দাঁড়ায়। পথে দেখা হওয়া বহু মানুষের কথা মনে পড়ে। কেউ কেউ অসাধারণ। কেউ কেউ বিস্মৃত। কেউ ক্ষমতাবান। কেউ ভঙ্গুর। বছর যেতে যেতে একটা জিনিস লক্ষ করলাম। বাইরের পার্থক্যগুলো ছিল বিশাল। ভিতরের পার্থক্য অনেক কম। যেখানেই গেছি, যে দেশেই কাজ করেছি, সব সময় এমন নারী-পুরুষের দেখা পেয়েছি যারা একই প্রশ্নের সঙ্গে লড়ছে। কীভাবে একটা কথা রাখা যায়।

কীভাবে একটা পরিবারকে আগলে রাখা যায়। কীভাবে একটা ক্ষতির মুখোমুখি হওয়া যায়। হাল ছেড়ে দেওয়া সহজ হলেও কীভাবে দাঁড়িয়ে থাকা যায়। কীভাবে চালিয়ে যাওয়া যায়। সব সময় শুধু এটুকুই। চালিয়ে যাওয়া। হয়তো সেজন্যই এই গল্প ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতি পেরিয়ে যেতে পারে। একটা কোম্পানির কথা বলে বলে নয়। আমার কথা বলে বলে নয়। বরং এমন কিছুর কথা বলে বলে, যা প্রত্যেক মানুষ চিনতে পারে। উত্তরাধিকার। অর্থনৈতিক উত্তরাধিকার নয়। বস্তুগত উত্তরাধিকার নয়। অদৃশ্য উত্তরাধিকার। যেটা কোনো সইসাবুদ ছাড়াই এক মানুষ থেকে আরেক মানুষে চলে যায়। যেটা কোনো দলিল-লেখক প্রমাণ করতে পারে না। যেটা ধরা পড়ে কঠিন মুহূর্তে নেওয়া কোনো সিদ্ধান্তে। রাখা একটা কথায়। মেনে নেওয়া একটা ত্যাগে। সাক্ষীহীনভাবে করা একটা বর্জনে। ছোটবেলায় ভাবতাম, লক্ষ্য হলো পৌঁছানো। পাওয়া। জয় করা। জেতা। আজ আর তেমন নিশ্চিত নই। আজ আমি বিশ্বাস করি, একটা জীবনের আসল মাপকাঠি অন্য। কোলাহল থেমে গেলে কী থেকে যায়? পদবিগুলো মুছে গেলে কী টিকে থাকে?

মানুষগুলো চলে গেলে কী হাঁটতে থাকে? যে উত্তর আমি পেয়েছি, তা সহজ। থেকে যায় সেটাই, যা আমরা এগিয়ে দিয়েছি। থেকে যায় সেটাই, যা আমরা না বুঝেই শিখিয়েছি। থেকে যায় সেটাই, যেভাবে আমরা অন্যদের সঙ্গে ব্যবহার করেছি। থেকে যায় সেটাই, আমরা যা হয়ে উঠেছি। আর থেকে যায় রক্ত। জৈবিক রক্ত নয়। আত্মীয়তার রক্ত নয়। নৈতিক ধারাবাহিকতা হিসেবে রক্ত। একটা সুতো হিসেবে। একটা অন্তর্ভুক্তি হিসেবে। চলমান স্মৃতি হিসেবে। এই কারণেই এই গল্প কোনো পণ্য দিয়ে শুরু হয় না। কোনো ব্র্যান্ড দিয়ে শুরু হয় না। এমনকি কোনো মানুষ দিয়েও শুরু হয় না। শুরু হয় একটা উত্তরণ দিয়ে। সময় পেরিয়ে যাওয়া এক অদৃশ্য ব্যাটন। এক প্রজন্ম থেকে পরের প্রজন্মে। এক হাত থেকে আরেক হাতে। এক নাম থেকে আরেক নামে। তিনজন মানুষ। তিনটি যুগ। তিনটি আলাদা পথ। একটাই সুতো। তিনটি ব্লেড। এক রক্ত। আর বাকি সব আসে তারপর।


Ferdinando Frega
Gillette Man ⚔️

PDF← সম্প্রদায়ের গাথা

অন্য গাথাগুলি দেখুন

The Corpus · Maps · Library · Vatican · One Door · Genesis · Opera · Wood · Contact

← Return to Main